সামাজিকতাঃ পর্ব-১ (অফিসে সামাজিকতা)

সমাজ, সামাজিক ও সামাজিকতা মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। কেউ কেউ বলবে অক্সিজেন না থাকলে আপনি বেঁচে থাকবেন না। হ্যা সেটা সত্যি। কিন্তু দেহের বেচে থেকে লাভ কি? যদি মনটাই মারা যায়। বর্তমান সমাজে মানুষ ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অকল্পনীয়। বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে৷ আর এই ঐক্যবদ্ধতার সূত্রটা ঠিক এমন- মানুষ>> সমাজ>>সামাজিক >>সামাজিকতা>> ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। সুন্দর সামাজিক জীবন সব সময়ই আনন্দময়। মাঝে মাঝে সবারই একা লাগতে পারে, সেটা ব্যাপার না । কিন্তু দীর্ঘদিন সমাজবিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার অনেক কারণ থাকতে পারে, হয়ত কেউ তার চারপাশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারছে না। হয়তো তাদের জীবনযাত্রায় মিল নেই। হয়তো কেউ কেউ তার সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজনদের আচার আচরণ, চলাফেরার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। হয়তো একে অন্যকে নিজের যায়গা থেকে উপলব্ধি করতে পারছে না। এমন আরোও হাজারটাও কারন থাকতে পারে।

সমাজবদ্ধ মানুষ যদি সামাজিক না হয় তাহলে মানুষে মানুষে দুরত্ব সৃষ্টি হয়, মানুষ একা হয়ে পড়ে। আর মানুষ একা কখনই সমাজে চলতে পারেনা। তাই সমাজে মানুষ নিয়ে বসবাস করতে চাইলে মানুষকে হতে হয় সামাজিক, জানতে হয় জীবন চলার পথে তাকে কখন কি সামাজিকতা অবলম্বন করতে হবে। আজ এমন কিছু সামাজিকতার সিরিজ আর্টিকেল নিয়ে আলোচনা করবো আমি।

১ম পর্বের আলোচনার বিষয়ঃ কর্মক্ষেত্রে/অফিসে সামাজিকতা

অফিসে সামাজিকতাঃ

একসাথে কাজ করার সুবাদে বিভিন্ন মতাবলম্বী বা সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে ঐক্যমত পোষণ করে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। আমাদের সবার আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকলেও অফিস আওয়ারে নিজের ব্যক্তিত্বের প্রভাব যত সম্ভব কম বিস্তার করাটা যুক্তিসঙ্গত। কারণ কারো সাথে মিলেমিশে কাজ করার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার মন-মানসিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই একক আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অপরের কাজে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

অফিসে সামাজিকতাঃ বিশেষ ভাবে করণীয়

* যেকোনো পরিস্থিতিতে মৃদু হাসি দিয়ে সহকর্মীর সাথে আলাপন শুরু করবেন।

* যখন কারও কাছ থেকে কিছু নেবেন তখন, ‘প্লিজ বা অনুগ্রহ করে’ বলুন।

* উপকারকে স্বীকৃতি দিন। বিনিময়ে কিছু অবশ্যই দেবেন, একটা মৃদু হাসি সময় ধন্যবাদ হলেও দিবেন।  প্রতিশ্রুতি দিন এবং রক্ষা করুন।

* বিভিন্ন জাতীয় দিবস আর উৎসব-পার্বণে অফিসের নিয়ম মেনেই শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে অফিস করতে পারেন।

* বিশেষ দিবসগুলোতে সহকর্মীদের কার্ডের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। মুঠোফোনের খুদে বার্তা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেসেজ দেওয়া শুভেচ্ছা জানাতে দারুণ কার্যকর।

* মাঝেমধ্যে সহকর্মীদের সঙ্গে দুপুরের লাঞ্চ করতে পারেন।

* জন্মদিন বা সহকর্মীর বিবাহবার্ষিকীতে অফিসে কেক কেটে তাঁকে উৎসাহ দিতে পারেন।

* কারও জন্মদিনের জন্য ব্যক্তিগত উপহারের বদলে কয়েকজন সহকর্মী মিলে উপহার কেনার চেষ্টা করবেন।

* অফিসের অন্য বিভাগের সহকর্মীদের বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলবেন না।

 

অফিসে সামাজিকতাঃ যা যা করবেন না

 

* একঘেয়েমি বা ঘাড়ত্যাড়ামি করবেন না। কাজ করার সময় নিজের মধ্যকার একঘেয়ে স্বভাব পরিহার করতে হবে। একঘুয়েমি আচরণে অপরাপর ব্যক্তির মানসিকতায় প্রচন্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে করে কর্ম পরিবেশে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। সহকর্মিদের পারস্পরিক সম্পর্কে দূরত্ব বেড়ে যায়।

* অধীনস্থ তার ছুটি কারনে বা অকারনে যে কারনেই কাটাক দয়া করে রাগ, গোস্বা, অভিমান করবেন না। সেটা তার প্রাপ্য। উপরন্তু তাকে রিচার্জড হয়ে কাজে ফেরার আমন্ত্রন জানান।

* সহকর্মী আপনার কাজটা বুঝে দেওয়ার পর ঘরে বাইরে কখন কতক্ষণ ফেসবুকিং কিংবা নেটওয়ার্কিং করলো সে বিষয়ে কানাঘুঁষা করবেন না। কারন স্যোশাল মিডিয়া শুধু টাইম পাসের বা টাইম ওয়েস্টের বিষয় নয়। বর্তমান টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লবের যুগে এগুলোর রয়েছে অনেক শিক্ষনীয় দিক। আপনার অফিশিয়াল অনেক সোর্সিংয়ের কাজও আপনার সহকর্মী স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে করছে তা আপনি নিজেও জানেন না।

* বদভ্যাস ছড়াবেন না।  চারপাশের পরিবেশকে ব্যক্তিগত কোনো বদভ্যাসে নোংরা করবেন না। ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী প্রত্যেকের কম-বেশি বদ অভ্যাস থাকতেই পারে।  অপরাপর কারো সামনে বিশেষ করে সহকর্মিদের সামনে বদভ্যাসগুলো চর্চা না করাই শ্রেয়।

* একজনের সাথে অন্যজনের ব্যাপারে পরনিন্দা করবেন না। কারো দোষত্রুটি প্রচার করা কখনোই সভ্য আচরণের মধ্যে পড়ে না। আর অফিসে সব সহকর্মিকে আপনার ভালো না-ও লাগতে পারে। তাই বলে কারো পিছনে তার সম্পর্কে নিন্দা করা ঠিক না। এতে করে আপনার সম্পর্কেই অন্যদের মনে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হবে।

* অন্য ধর্মের সহকর্মীকে ধর্ম নিয়ে এমন প্রশ্ন করবেন না যাতে করে সে বিব্রত বোধ করবে বা মনে কষ্ট পাবে।

* কারও উপর অযথা হস্তক্ষেপ করবেন না। নিজের কর্মসীমার বাইরে অযথা হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ আপনাকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে দেয়।

* কোনো সহকর্মীর সামনে নাক খুঁটবেন না।

* খোলা মুখে হাঁচি কাশি দিবেন না। সবার সামনে হাঁচি কাশি দিলে অবশ্যই মুখে হাত/ রুমাল / টিস্যু রাখবেন।

* অলসতা ছাড়ার সময় মুখে অবশ্যই হাত রাখবেন। কারনটা জানতে হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদিন নিজেকে দেখবেন।

* আশপাশে তিন ফুটের মধ্যে কেউ থাকলে মুখ থেকে থুথু ছিটিয়ে মারবেন না।

* সহকর্মীদের সাথে ফোনে কথা বলার সময় মুখ থেকে থুথু ফেলা বা গলা টানার শব্দ করবেন না।

* কাজ আটকে রাখবেন না। পদবী অনুসারে কাজের পরিধি নির্ধারিত হয়। তাই আপনার পদ অনুসারে কাজের ফাইলগুলো টেবিলে অলস ফেলে রাখবেন না। এতে আপনার সম্পর্কে সহকর্মিদের মনে বাজে ধারণা জন্মাবে। টেবিলে কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করে ডেলিভারি দেয়ার জন্য চেষ্টা করবেন।

* কোনো কিছুর অপব্যাখ্যা করবেন না অফিসের জুনিয়র বা সিনিয়র কর্তাব্যক্তি কিছু জানার প্রয়োজনে আপনার কাছে আসতে পারে। তাই জিজ্ঞাসিত বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রদান করুন। সঠিক উত্তর না জানলে তার নিকট থেকে সময় চেয়ে নিন অথবা সরাসরি বলে দিন- দুঃখিত সঠিক উত্তরটি আমার জানা নেই। এতে করে আপনার সম্পর্কে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।

* মিথ্যাচার করবেন না। ‘মিথ্যা কথা বলা’ এই একটি গুণ আপনার সব অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই মিথ্যা বলা কমিয়ে দিন। সত্য বলার চর্চা বাড়িয়ে দিয়ে মিথ্যা বলার বদভ্যাসটি একেবারের জন্য ত্যাগ করুণ। প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে ধীরে ধীরে যেকোনো অভ্যাসই বাদ দেয়া বা আয়ত্বে আনা সম্ভব।

* নারী সহকর্মীদের ডেস্কে সে বসে থাকা অবস্থায় তার সামনে দাড়িয়ে বা হেলে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন না।

* যত গুরুত্বপূর্ণ কথাই হোক না কেনো মোবাইলে উচ্চস্বরে কথা বলবেন না। অতি প্রয়োজনে বারান্দা ব্যবহার করতে পারেন।

* এসির তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করবেন। সকলের শরীর সমান তাপমাত্রা সহনীয় নয়, সুতরাং এসি নিয়ে বিতর্কে যাবেন না।

* ধুমপান করলে অবশ্যই মাউথ ফ্রেশনার ব্যবহার না করে ডেস্কে বসবেন না। প্রয়োজনে সামান্য বডি স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন।

* একাধারে অনেকক্ষণ কোনো সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে থাকবেন না।

* কানকথা শুনবেন না। ইগো নয়, নিজের বিবেকের নির্দেশ অনুসরণ করবেন।

* ডেস্কটাকে কখনই কাগজ ও ফাইলের স্তুপ বানাবেন না। তাতে করে আপনার রুচি নিয়ে যেমন সবার মনে প্রশ্ন উঠবে তেমনি আপনার নিজের প্রোডাক্টিভিটিও কমতে থাকবে। কারন যতবার আপনি আপনার পাশে জমিয়ে রাখা কাগজ ও ফাইলের দিকে তাকাবেন তত বেশি কাজের প্রতি পেইন ফিল করবেন। পারলে জমিয়ে রাখা কাজগুলোকে ” টু-ডু” লিস্টের মাধ্যমে একের পর এক শেষ করবেন।

* ফ্লোরে/ মেঝেতে শব্দ তৈরী করে এমন কোনো জুতা/ হাই হিল পরবেন না।

* মেঝেতে পা ঘষে হাঁটবেন না।

* খাবার সময় উচ্ছিষ্ট টেবিলে ফেলবেন না।

* কমন গ্লাস হলে ঠোঁট লাগিয়ে পানি পান করবেন না। পারলে পার্সোনাল ওয়াটার বটল ইউজ করবেন।

* ক্যান্টিনের বেসিনে হাত ধোঁয়ার সময় পানির ট্যাপের স্পিড বাড়িয়ে দিবেন না। এমনভাবে হাতমুখ ধোবেন না যাতে করে অন্যের গায়ে পানি ছিটে লাগে।

* বেসিনে হাতমুখ ধোঁয়ার সময় জোরে শব্দ করে গড়গড়া করবেন না।

* টয়লেট ব্যবহার শেষে – ঠিক আপনি টয়লেটে প্রবেশ করে টয়লেটটিকে যেভাবে দেখতে চান সেভাবে রেখে যাবেন।

* ইউরিনালে দাড়ালে অবশ্যই খুব স্লো স্পিডে পানি ছেড়ে রেখে কর্ম সারবেন।

* আর দয়া করে নিজের বুঝ-টা (২+২=৫) সহকর্মী বুঝতে না চাইলে তাকে জোর করবেন না। কারন সে কিন্তু আপনার চাকরি করে না। মনে রাখবেন সে যে প্রতিষ্ঠানের কর্মী, আপনি হয়তোবা সেই একই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কিন্তু মালিক নন।

* অফিসে বসের মন জয় করতে গিয়ে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে কাজ করবেন না। টিমের সাথে সংযোগ রক্ষা করুন সবসময়। একত্রে থাকার অনুশীলন করুন। তার মানে এই নয় যে, আলাদা দল গড়ে তুলবেন!

* কোনো সহকর্মী আপনার টেবিলে কোনো কাজে আসলে তাকে চেয়ার না থাকা অবস্থায় বসতে বলবেন না- তাতে সে লজ্জা পাবে। পারলে যেকোনো ভাবে তাকে চেয়ারের ব্যবস্থা করে দিবেন। মনে রাখবেন – অনুগত মানেই দাঁড়িয়ে থেকে মাথা নিচু করে থাকা নয়। পাশে বসিয়েও অনেক অসাধ্য সাধন করিয়ে নেওয়া যায়।

* রাগের বহিঃপ্রকাশ চোখ বড় করে নয়, পারলে মৃদু হাসি হেঁসে তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলতে পারেন – ” কাজটি সুন্দরভাবে শেষ করেছেন,  কিন্তু আমার মতে ঠিক এভাবে করলে আপনার নামের সুবিচার হবে “।

* একজন সহকর্মীর সামনে অন্যজনের সাথে ফিসফিস করে বা কানে-মুখে কথা বলবেন না।

* উৎসব বা সামাজিকতার নামে কোনো সহকর্মীর সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়, যার কারণে তিনি বিব্রত হন।

* অফিসের সময়েই চেষ্টা করবেন যত আনুষ্ঠানিকতা সারতে, সহকর্মীর ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশের চেষ্টা বেশির ভাগ সময়ই নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করে।

* ফেসবুক কিংবা সামাজিক যোগাযোগের অন্য মাধ্যমগুলোতে এমন কিছু লিখবেন না বা এমন ছবি দেবেন না যাতে সহকর্মীরা বিব্রত হন।

আলোচ্য বিষয়গুলো আমাদের নিত্যদিনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের প্রায় সবার এসব ব্যাপারে কম-বেশি জানা থাকলেও সচেতনতার অভাবে ভুল হয়ে যায়। আর সেই ভুল থেকেই শুরু হয় একা হতে থাকা,  মানুষ হতে বিচ্ছিন্ন হতে থাকা।

পারবেন জীবনটাকে একা একা কাটাতে? কেউ পারেনা। তাই চেষ্টা করুন দিনে অন্তত একজন করে গুণগ্রাহী তৈরী করতে। দেখবেন বছরে ৩৬৫ জন মানুষকে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে পেয়েছেন।।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.